blog-details
21
Nov
লিখেছেন ~ "Umesbah11"

পুনর্বাসন সেবার প্রয়োজনীয়তা (বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গ্লোবাল বার্ডেন  অব ডিজিজ (GBD) অনুসারে পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (.৪১ বিলিয়ন) মানুষের পুনর্বাসন সেবা প্রয়োজন। ২০২১ সালের Lancet-এর গবেষণা দেখিয়েছে, রিহ্যাবিলিটেশন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার একটি অপরিহার্য উপাদান হওয়ায় প্রাথমিক স্তরেই সেবা দ্রুত বিস্তারের প্রয়োজন, এবং নীতিনির্ধারকদের জনগণের চাহিদা পূরণে এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বয়সী মানুষের সংখাও বেড়েছে।  মারাত্মক অসুখ দুর্ঘটনার ফলে প্রতিবন্ধকতা এবং অক্ষমতাও বেড়ে চলছে। বাংলাদেশে ডিজ্যাবিলিটি সবচেয়ে বেশি বাড়ছেমোটর নিউরো সিস্টেম সমস্যামাস্কুলোস্কেলেটাল রোগথেকে। উদাহরণস্বরূপ, গার্মেন্টস এবং কৃষিখাতের শ্রমিকদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৬২%-এরও বেশি শ্রমিক কোনো না কোনো রকম পেশীব্যথায় ভুগছেন। এই রোগগুলো অবশ্যই ফিজিওথেরাপি শরীরচর্চার মাধ্যমে প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা করা যায়।

এছাড়াও অনেক সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে পুনর্বাসন চাহিদা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর প্রায় ২৩,০০০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন (প্রায় দৈনিক ৬৪ জন) এবং প্রায় . মিলিয়ন আহত হন, যাদের মধ্যে ৮০,০০০ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধী হন। হৃদরোগ, স্ট্রোক ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসুখে হাজার হাজার মানুষ অস্থায়ী বা স্থায়ী অক্ষমতায় ভুগে। আন্তর্জাতিক এক গবেষণা বলেছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ বাস করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি ১০ টি পরিবারের মধ্যে টি পরিবারের চিকিৎসা খরচের কারণে আর্থিক বিপর্যয় ঘটে এবং প্রতি ২০ টি ধনী পরিবারের  মধ্যে টি পরিবার  দারিদ্র্য পতিত হয়।

বাংলাদেশে শীর্ষ পাঁচটি মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত চিকিৎসা পান, কিন্তু বাসায় বা কমিউনিটিতে জরুরি পুনর্বাসন সেবা পায় না।

বাংলাদেশে মাত্র কয়েক হাজার শারীরিক পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ (ফিজিওথেরাপিস্ট) আছে। ২০২৩ সাল অনুযায়ী সমগ্র দেশে মাত্র প্রায় ,৮০০ জন ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১৬ জন ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছে। কিন্তু এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে ১৫৬ জন প্রতিবেশী দেশ ভারতে এর সংখ্যা প্রতি ১০ লাখ ৬০ জন। অর্থাৎ, বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় ফিজিওথেরাপিস্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।

এই কম সংখ্যার ফিজিওথেরাপিস্টদের অনেকাংশই ব্যক্তিগত ভাবে পুনর্বাসন সেবায় নিয়োজিত। সরকারিভাবে খুবই সীমিত পরিসরে ডিপ্লোমা (মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট) পর্যায়ের ফিজিওথেরাপি সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ স্নাতকডিগ্রীধারী ফিজিওথেরাপিস্টরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নিয়োগের অভাবে উল্লেখযোগ্য ভাবে অবদান রাখতে পারছেন না। অনেক সময় স্বাস্থ্য পরামর্শদাতারাও ফিজিওথেরাপিস্টদের গুরুত্ব বুঝে উঠেন না, ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বেশ কিছু উন্নত দেশে ফিজিওথেরাপিস্ট পেশা সুসংহত স্বীকৃত। যেমন যুক্তরাজ্যে “Physiotherapist”  আইনিভাবে সুরক্ষিত এবং HCPC (Health and Care Professions Council) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যুক্তরাজ্যে ফিজিওথেরাপিস্টদের স্বাধীন ঔষধ নির্ধারণের (independent prescribing) অধিকার বিশেষ প্রশিক্ষণ রয়েছে। এই কারণে তাদের স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা হাসপাতাল-পর্যায়ে রোগনির্ণয়, চিকিৎসা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী দেখাশোনায় ব্যাপক অবদান রাখে।

অস্ট্রেলিয়াতেও ফিজিওথেরাপিস্টরা স্বীকৃত পেশাজীবী। ২০২৫ সালের হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ১৬০৩ জন নিবন্ধিত ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছে।

এটা খুবই স্পষ্ট যে যেসব দেশ ফিজিওথেরাপির প্রতি গুরুত্ব দেয়, তারা অনেক সুফল পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশ করে যে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ অর্জনে শুধু রোগ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা নয়, পুনর্বাসন সেবাও মূল ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি সেবা যথাযথ ভাবে প্রদান করা হলে রোগীরা দ্রুত সেরে ওঠবে কর্মক্ষম জীবনে তাড়াতাড়ি প্রত্যাবর্তন করতে পারবে। Lancet এবং WHO’ সমীক্ষায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর জন্য পুনর্বাসন বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষ করে কমিউনিটি গ্রাম পর্যায়ে।

ফিজিওথেরাপি প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে স্বাস্থ্যেখাতের সম্ভাব্য উপকার অনেক। হাড় পেশী সংক্রান্ত রোগসমূহ, স্ট্রোক বা দুর্ঘটনার পর বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার জন্য সময়মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা না পেলে রোগীর প্রতিবন্ধকতা বেড়ে যায়। সঠিক সময়ে পুনর্বাসন পেলে অসুস্থ ব্যক্তি দ্রুত সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারে, ফলে পরিবারের আর্থিক বোঝা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, রোগনির্ণয় পরবর্তী অনুশীলন থেরাপি ব্যক্তিকে পূর্ণ কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। উপরন্তু, দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা বৃদ্ধি পায়কারণ সঠিক পুনর্বাসন সেবা পেলে রোগীকে বার বার জরুরী সেবার জন্য আসতে হয় না।  আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্বাসন সেবা না পেলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো গরিব হয়ে পড়ে। তাই ফিজিওথেরাপিস্টদের ক্ষমতায়ন এবং সেবার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও মজবুত করবে।

পুনর্বাসন সেবা সম্প্রসারিত বাস্তবায়ন করা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে এখনই স্থান পাওয়া উচিত। ফিজিওথেরাপিস্টদের সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে নিয়োগ না দেওয়া মানে শত শত হাজার জনকে পুনর্বাসনে বঞ্চিত রাখা। এর ফল ভোগ করছে রোগী, পরিবার এবং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮ ফিজিওথেরাপিস্টকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষিত লাইসেন্সধারী পুনর্বাসন পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও কাউন্সিলের নিবন্ধন লাইসেন্সিং কার্যক্রম এখনো শুরু না হওয়ায় পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ রোগী নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। দেশে এখনো জাতীয় পর্যায়ে কোনো ফিজিওথেরাপি কলেজ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মানবসম্পদ ঘাটতি রয়ে গেছে, যদিও এনসিডি, স্ট্রোক, ট্রমা আরএমজিনির্ভর কর্মসংস্থানের কারণে পুনর্বাসন সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। পুনর্বাসন সেবা ছাড়া Universal Health Coverage (UHC) অর্জন সম্ভব নয় এবং সরকারি হাসপাতাল থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত সেবা সম্প্রসারণে দক্ষ কর্মী স্বল্পতা বড় বাধা। উন্নত দেশগুলো যেখানে পুনর্বাসনকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল স্তম্ভে সংযুক্ত করেছে, বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে আছে। তাই আইন বাস্তবায়ন, যোগ্য ফিজিওথেরাপিস্ট

Treat Pain Get Moving Seek Recovery